‘মানুষ মেরে লাশ ঝুলিয়ে রাখার মতো বর্বরতা, জানোয়ারের মতো ব্যবহার’-এগুলো কেউ করতে পারে কিনা সেই প্রশ্ন জাতির কাছে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের লাশ ঝুলিয়ে রাখবে পা বেঁধে! যারা এসবের সঙ্গে জড়িত অবশ্যই তাদের বিচার হবে। তাদের বিচার করতে হবে। না হলে মানুষের নিরাপত্তা দেয়া যাবে না। গতকাল রোববার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সম্প্রতি নিহত ৩৪ জনের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল মারিয়া সিসতিয়াগা ওচহোয়া ডি চিনচিক্রু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে জামায়াত-শিবির ছদ্মবেশে অনুপ্রবেশ করেছিল। তিনি বলেন, জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা প্রাথমিকভাবে লো-প্রোফাইল বজায় রেখে কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ছদ্মবেশে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু পরে তারা বিপজ্জনকভাবে আন্দোলনের সামনের সারিতে চলে আসে। শেখ হাসিনা বলেন, সন্ত্রাসীরা আসলে সেই স্থাপনাগুলোতে হামলা করেছে যা জনগণের কল্যাণে কাজ করার পর সরকার যে সাফল্য অর্জন করেছে তা তুলে ধরছে। এই প্রসঙ্গে তিনি কোভিড হাসপাতাল, মেট্রো রেল, এক্সপ্রেসওয়ে, সেতু ভবন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবন ও ডেটা সেন্টারের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমাদের সকল উন্নয়নের প্রতীক, যা জনগণকে স্বাচ্ছন্দ্য ও সুবিধা দিয়েছিল, সেগুলো ধ্বংসের শিকার হয়েছে। সহিংসতায় তার দল আওয়ামী লীগের প্রায় ২১ জন নিহত হয়েছে বলে এ সময় জানান তিনি।
নিহতদের পরিবারের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি তো বুঝি আপনাদের বেদনা। প্রতিনিয়ত বাপ-মা-ভাই-বোনদের হারানোর ব্যথা নিয়ে আমাদের চলতে হয়। এমনকি লাশটাও দেখতে পারিনি, কাফন-দাফনটাও করতে পারিনি। দেশেও ফিরতে পারিনি। ছয় বছর দেশে ফিরতে দেয়নি আমাকে। যখন দেশে এসেছি, সারাদেশ ঘুরেছি। এই দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছি। সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু বারবার এই ধরনের ঘটনা ঘটাবে, এই সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটাবে এটা তো কাম্য না। মানুষ কী দোষ করলো যে এভাবে খুন করতে হবে সেই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, মানুষ খুন করে সরকার পতন এটা কবে হয়, কখন হয়? সাধারণ মানুষ কী দোষ করেছে? আমি আসলে আপনাদের কী বলে সান্ত্বনা দেবো? শুধু এটুকু বলবো যে আমি আপনাদের মতোই একজন। বাবা-মা হারানো এতিম। কাজেই আপনাদের কষ্ট আমি বুঝি। আমি আছি আপনাদের জন্য, আপনাদের পাশে। শেখ হাসিনা বলেন, আমার চেষ্টা থাকবে যারা এই খুনের সঙ্গে জড়িত, খুঁজে খুঁজে বের করে তারা অবশ্যই যেন শাস্তি পায় সেটাই আমার প্রচেষ্টা থাকবে, আমি সেটাই করবো। আপনাদেরও সাহায্য চাই। কারণ এভাবে বারবার বাংলাদেশটাকে নিয়ে খেলা আর হতে দেয়া যায় না। কাজেই আমি আপনাদেরই সাহায্য চাই। তিনি বলেন, এটুকু মনে রাখবেন, আপনারা আপনজন হারানোর একটা শোক সইতে পারেন না। আর আমি কী শোক সয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। কেন? এই দেশের মানুষের জন্য। কিন্তু আজ এইভাবে বাধা দেয়া, যা কিছু করি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেয়া এটা তো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সাধারণ মানুষই তো সুবিধা পেতো। মেট্রোরেলে কারা চড়ে, এক্সপ্রেসওয়েতে কারা চলে...? মানুষের কাজ করাটাই আমার কাজ। নিহতদের স্বজনদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, আপনাদের কাছে শুধু এইটুকু বলবো, আপনারা সবুর করেন। আর আল্লাহকে ডাকেন যেন এই সমস্ত খুনি-জালেমের হাত থেকে আমাদের দেশটা রেহাই পায়। আমি আপনাদের সঙ্গে আছি, পাশে আছি। আমারও আপনাদের চোখের পানি দেখতে হচ্ছে। এটিই সবচেয়ে কষ্টের। স্বজন হারানোর ব্যথা ভোলার না, সেটা আমি জানি। তবু আল্লাহ আপনাদের সবুর দিন, সেটা আমি চাই। এর আগে কোটা আন্দোলন ঘিরে সাম্প্রতিক সহিংসতায় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ নিহত ৩৪ জনের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় নিহত স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিবারের সদস্যদের খোঁজ-খবর নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের অনেকে প্রধানমন্ত্রীকে জড়য় ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। আবেগাপ্লুত প্রধানমন্ত্রীও কান্নায় ভেঙে পড়েন। অশ্রুসজল চোখে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেন তিনি। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তাদের সাহস দিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, আমাকে দেখেন, কত শোক নিয়ে বেঁচে আছি। আপনাদের চোখের জল আমাকে দেখতে হচ্ছে, এটা আমার দুঃখ। একরাতে বাবা-মা-ভাইসহ পরিবারের স্বজনদের হারানোর বেদনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনাদের সান্ত্বনা দেয়ার ভাষার আমার নেই। আপনাদের কষ্ট আমি উপলব্ধি করতে পারি। আর্থিক সহায়তা দেয়ার সময় আরও উপস্থিত ছিলেন- জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতসহ অন্যরা।
সম্প্রতি কোটা বাতিল করে জারি করা সরকারের পরিপত্র অবৈধ করে হাইকোর্ট। ওই রায়ের পর আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সেই আন্দোলন সহিংস রূপ ধারণ করলে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সরকার বলছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ঢুকে নাশকতা চালিয়ে ফায়দা নিতে চেয়েছে বিএনপি-জামায়াত-শিবির ও জঙ্গিরা। গত ১৮ জুলাই সারাদেশে ব্যাপক সহিংসতা চলে। বিটিভিসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট চলে। নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা চালিয়ে আট শতাধিক আসামি ছিনতাই করা হয়, যাদের মধ্যে রয়েছেন চিহ্নিত জঙ্গিরা। লুটে নেয়া হয় বহু অস্ত্র। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৯ জুলাই রাত থেকে সারাদেশে কারফিউ জারি করে সরকার। ঘোষণা করা হয় সরকারি ছুটি। টানা পাঁচদিন কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে সারাদেশ। গত বুধবার থেকে সীমিতভাবে অফিস খুলেছে। গতকাল রোববার থেকে কারফিউ শিথিলের সময় বাড়ানো হয়েছে। বেড়েছে অফিসের চলার সময়ও। অরাজক অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে দেশ।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

গণভবনে আন্দোলনে নিহত ৩৪ পরিবারকে সহায়তা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী
কোটা আন্দোলনে জামায়াত শিবির ছদ্মবেশে ঢুকে পড়ে
- আপলোড সময় : ২৯-০৭-২০২৪ ১০:৪৯:৪৯ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৯-০৭-২০২৪ ১০:৪৯:৪৯ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ